উল্টো দিকে দেহের অধিকাংশ প্রত্যঙ্গই, বাঁচলেন ৯৯ বছর!

Sunday, April 14th, 2019

দেহের অধিকাংশ প্রত্যঙ্গই উল্টো দিকে, বাঁচলেন ৯৯ বছর!

চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্ময় হয়ে রয়েছেন রোজ মেরি বেন্টলি। ছবিটা কোনো এক সময়ের সুখস্মৃতি, বড় একটা মাছ ধরেছেন তিনি

ডেস্ক নিউজঃ ২০১৮ সালের কোনো এক বসন্তের দিন। পোর্টল্যান্ডের অরিগন হেলথ অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সির লাশের ঘরে ভাসছে ফরমালডিহাইডের গন্ধ। চলছে অ্যানাটমি ক্লাস। একটি মরদেহকে ঘিরে রয়েছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ২৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ওয়ারেন নিলসেন এবং তার চার সহপাঠী। আরো ১৫টা টেবিলের সামনে পাঁচটি দল ভীড় করে রয়েছেন। পাঠ্যবইয়ে এতদিন ধরে রহস্যময় মানবদেহের যে ছবিগুলো তারা দেখেছিলেন, তার বাস্তব রূপ দেখতে উদগ্রীব তারা।

নিলসেনের দলকে দেয়া হয়েছে ৯৯ বছর বয়সী এক নারীদের মরদেহ। তার নাম চিল রোজ মেরি বেন্টলি। তবে নাম পরিচয় তখনো জানতো না দলটি। এই দেহগুলো তাদের যারা জীবিত অবস্থায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন। খুব দ্রুতই এই দল এবং তাদের প্রফেসর জানতে পারবেন, বেন্টলির দেহটা সত্যিকার অর্থেই অন্যরকম, একেবারেই অন্যরকম। কেউ জানতেন না, এই দেহটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থান করে নেবে।

এর কারণ হলো, বেন্টলি দেহে বিশেষ এক অস্থার সন্ধান মিলেছে যাকে বলে ‘সিটাস ইনভার্সাস উইথ লেভোকার্ডিয়া’। এ অবস্থায় দেহের অভ্যন্তরের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যঙ্গগুলো উল্টো স্থানে থাকে, ঠিক যেন দেহের অভ্যন্তরটা কোনো আয়নায় দেখা হচ্ছে। এটা মানবদেহের একেবারেই অস্বাভাবিক অবস্থা, কিন্তু বিস্ময়কর এবং সুন্দর! মুহূর্তেই বেন্টলি চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক রূপকথায় পরিণত হয়ে যান।

ওই দলের সহকারী প্রফেসর ক্যামেরুন ওয়াকার বলেন, আমার ধারণা এই নারীর মতো আরেকটা দেহ মিলতে পারে ৫০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে। সত্যি বলছি, এই দেহের কথা আমরা কখনো ভুলবো না।

দলটির অ্যাসাইনমেন্ট ছিল বুক চিড়ে হৃদযন্ত্র পরীক্ষা করা। নিলসেন জানান, তার হৃদযন্ত্রের বড় একটি ধমনী ছিল না। এটা সাধারণত ডান পাশে থাকে। শিক্ষার্থীরা কোনভাবেই ইনফেরিওর ভেনা কাভা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। প্রফেসরও অবাক। এত বড় একটি ধমনী তারা কেন খুঁজে পাবে না? অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেলো একেবারে বিপরীতে। সবাই ধাক্কা খেলেন একটা। সাধারণত ভেনা কাভা অবস্থান করে মেরুদণ্ডের ডানপাশে। এটা লিভারের নিচের দিকে বেঁকে থাকে।

বেন্টলির ধমনী ছিল বামপাশে। ওটা সরাসরি হৃৎপিণ্ডের দিকে না গিয়ে মধ্যচ্ছদা দিয়ে বুকের অংশের কশেরুকার সঙ্গে চলে গেছে, জানান ওয়াকার। আরো বললেন, আমাদের কারোরই এমন ধমনী নেই। তার ডান ফুসফুসের মাত্র দুটো লোব রয়েছে। অথচ এটা স্বাভাবিকভাবেই তিনটি থাকে। তার হৃদযন্ত্রের আট্রিয়ামও স্বাভাবিক আকারে দ্বিগুন ছিল।

এখানেই শেষ নয়। দেহের বামপাশে থাকে। কিন্তু বেন্টলিরটা ছিল ডানপাশে। আবার যকৃৎ প্রধানত ডানেই থাকে। কিন্তু বেন্টলিরটা বামে। তার স্প্লিন ডানে থাকার কথা। কিন্তু ওটার দেখা মিলল বামে। তেমনিভাবে তার পরিপাক নালী এবং মলাশয়ের উর্ধ্বগামী নালী ঠিক বিপরীত অবস্থানে ছিল।

ওয়াকার বলেন, বেন্টলির এই অবস্থা কেউ-ই জানতেন না। সম্ভবত গর্ভে থাকা অবস্থাতেই ৩০-৪৫ দিনের মাথায় তার প্রত্যঙ্গ এমন অবস্থানেই তৈরি হয়। কিন্তু কেন? তা কেউ জানে না।

এমনটা ঘটতে পারে প্রতি ২২ হাজার জন্মের মধ্যে একটি শিশুজন্মের। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে শিশুর হৃদযন্ত্রে ত্রুটি থাকে। তা পরিপূর্ণভাবে সুস্থ হয় না। এভানে জন্ম নিলেও ৫-১৩ শতাংশ পাঁচ বছর বয়সের আগেই মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু বেন্টলির বিষয়টা একেবারেই আলাদা। তার হৃৎপিণ্ডে কোনো ত্রুটি ছিল না।

আবার এই পরিস্থিতিই তার দীর্ঘ জীবন এনে দিয়েছে বলা যায়। এছাড়া অন্যান্য প্রত্যঙ্গের এমন অস্বাভাবিক অবস্থান তাকে প্রতি ৫০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে একজন হিসেবে তুলে ধরছে।
সূত্র: সিএনএন