তাহলে পার্থক্য রইল কোথায় আর্জেন্টিনার সঙ্গে বার্সার?

Sunday, April 14th, 2019

চোটগ্রস্ত মেসিই বার্সেলোনার ভরসা। ছবি: এএফপিচোটগ্রস্ত মেসিই বার্সেলোনার ভরসা। ছবি: এএফপি

 

ডেস্ক নিউজঃ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে বেশ ভালোই চোট পেয়েছিলেন লিওনেল মেসি। নাকে চোট পাওয়ার পরও মাঠ ছেড়ে উঠতে রাজি হননি। জেতার জন্য মরিয়া বার্সাকে রেখে উঠে গেলে কী অবস্থা হবে, তা কি আর মেসি জানতেন না! হয়তো এ কারণেই মুখে রক্তের ছাপ নিয়েও খেলে গেলেন। মেসি যে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, পাছে তাঁকে ছাড়া দলই না রক্তাক্ত হয়!

মেসি বার্সেলোনার হৃৎপিণ্ড। হয়তো ফুসফুসও। এবং যকৃৎ, কলিজা, মস্তিষ্কও। এই দলটা এত মেসিনির্ভর, প্রশ্ন ওঠে, বার্সেলোনা এত এত খেলোয়াড় কিনে যে গুচ্ছের টাকা ঢালল, তার ফলাফল কী? প্রশ্ন ওঠে, আর্জেন্টিনা না হয় নিরুপায়, দেশে জন্মানো খেলোয়াড়দের নিয়েই দল সাজাতে হবে, কিন্তু বার্সেলোনার তো সেই দায় নেই। তবু কেন বার্সেলোনা আর্জেন্টিনারই একটা কিঞ্চিৎ উন্নত সংস্করণ হয়ে উঠছে।

প্রশ্নগুলো আবারও তুলে দিল গতকাল লিগে বার্সেলোনার ম্যাচ। প্রথম দেখায় এই দলের জালে দুই হালি গোল দিয়েছিল বার্সেলোনা। ফিরতি দেখায় উয়েস্কা যখন আরও শক্তি হারিয়ে রেলিগেশনের আইসিইউতে; সেই দলটিই রুখে দিল বার্সেলোনাকে! গোলশূন্য ড্র। কে বলবে, দুই দল আছে লা লিগার পয়েন্ট টেবিলের দুই প্রান্তের শীর্ষে? অ্যাটলেটিকোর সঙ্গে ব্যবধানটা ১১ পয়েন্টের ছিল বলে রক্ষা। না হলে মৌসুমের এই প্রান্তে কোনো কোচই ঝুঁকি নিতে রাজি হন না। কিন্তু মেসিকে ছাড়া বার্সেলোনা যে অচল, সেটি তো বোঝা গেল আবার।এই মৌসুমে ৯ ম্যাচে মাঠের বাইরে ছিলেন লিওনেল মেসি। ৫ ম্যাচেই জয় পায়নি বার্সেলোনা। এর মধ্যে লেভেন্তের মতো দলের কাছেও হারতে হয়েছে। অন্যদিকে মেসি খেলেছেন এমন মাত্র ২ ম্যাচে হেরেছে দল। এই মৌসুমে লিগে ৩৬ পয়েন্ট বার্সেলোনা পেয়েছে শুধু লিওনেল মেসির গোলে। মানে, মেসির গোল নিশ্চিত করেছে জয় বা ড্র। এই পয়েন্ট বাদ দিলে এখন লিগের সেরা ১০-এ জায়গাই হতো না বার্সার। মৌসুমে মেসির মোট গোল ৪৩, সবচেয়ে কাছে থাকা লুইস সুয়ারেজের গোল প্রায় অর্ধেক (২৩)। মৌসুমে বার্সার পঞ্চম সর্বোচ্চ গোলদাতা একজন সেন্টার ডিফেন্ডার, আর তিন গোল হলে যিনি ধরে ফেলবেন বার্সার রেকর্ড সাইনিং ফিলিপে কুতিনহোকে (১০)।

কুতিনহো-ডেম্বেলে জুটিও ভরসার পাত্র হতে পারেনি। ছবি: টুইটারকুতিনহো-ডেম্বেলে জুটিও ভরসার পাত্র হতে পারেনি। ছবি: টুইটার

ফলে ভালভার্দের ট্রাম্প কার্ড একটাই। সমস্যা হলো, তূণ থেকে আসল তিরটা তিরন্দাজ বেশি বেশি ব্যবহার করলে সেটা আর ‘স্পেশাল’ থাকে কী করে। বার্সেলোনার জার্সিতে প্রায় ১৫ বছর ধরে খেলছেন মেসি। পেপ গার্দিওলার জামানা থেকেই দলের মূল ভরসা হয়ে আছেন। সবই ঠিক আছে। কিন্তু এতটা মেসি-নির্ভরতা আগে কখনোই ছিল না বার্সার। বার্সেলোনার মতো দল এক খেলোয়াড়কেন্দ্রিক ছিল না কখনোই। বরং তাদের দর্শনই হলো যূথবদ্ধতা। সবাই মিলে, সবার সঙ্গে। বার্সেলোনার আক্রমণ তো এভাবেই সাজানো হয়। এরই নাম তো ‘টিকিটাকা’।

এই সর্বনাশ অবশ্য এক দিনে হয়নি। ভালভার্দে একাও এর জন্য দায়ী নন। লুইস এনরিকে আসার পর থেকেই শুরু হতে থাকে পরিবর্তন। একে একে বার্সেলোনা থেকে মাঝমাঠের সেনানীরা সরে যেতে থাকেন, সেই শূন্যতার ভার জোয়াল হয়ে চেপে বসতে থাকে মেসির কাঁধে। এনরিকের জমানায় তবু সুয়ারেজ-নেইমাররাও কোনো কোনো দিন মেসিকে ভুলিয়ে দিতেন। ‘এমএসএন’-ত্রিফলায় বার্সা অনেকবারই বিদ্ধ করেছে প্রতিপক্ষকে। কিন্তু এন গেছে, এসের ধারও কোনো দিন তীক্ষ্ণ তো কোনো দিন ভোঁতা।

সব দায়িত্ব এসে পড়েছে লিওনেল মেসির কাঁধে। এই মৌসুমে ৪১ ম্যাচ খেলেছেন। সরসারি অবদান রেখেছেন ৬৪ গোলে। ৪৩ গোল, ২১ অ্যাসিস্ট।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে নিষ্প্রভ ম্যাচটা খেলেছেন। তবু এই ম্যাচের মূল নায়ক তিনি। আত্মঘাতী গোল হলেও পুরো বল বানানোর কাজটি করেছিলেন লিওনেল মেসি। এর আগের সপ্তাহে বার্সার লিগ প্রায় নিশ্চিত করে ফেলা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচেও মূল কারিগর মেসি। দুই গোলেই রয়েছে সরাসরি অবদান। ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে তাঁকে মাঠের বাইরে রেখেছিলেন ভালভার্দে। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে মেসির শরণ নিতে হয়। ২-৪ গোলে পিছিয়ে পড়া ম্যাচ থেকেও এক পয়েন্ট এসেছে মেসির কারিকুরিতেই।

রোনালদো ছাড়া রিয়ালের অবস্থা শঙ্কা জাগাচ্ছে বার্সার মনে। সংগৃহীত ছবিরোনালদো ছাড়া রিয়ালের অবস্থা শঙ্কা জাগাচ্ছে বার্সার মনে। সংগৃহীত ছবি

এই মৌসুমে অসংখ্যবার এই দৃশ্য দেখা গেছে। মেসি নেই তো বার্সাও নেই, বার্সার ত্রাহি ত্রাহি দশা; তখনই মেসি আবির্ভূত হয়েছেন ত্রাতায়। দলের পুরো দায়িত্ব একা কাঁধে তুলে নিতে হয়। এই বার্সেলোনা এখন আর্জেন্টিনাই! মেসি ছাড়াও তো আর্জেন্টিনাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

ভয়টা তাই অন্যখানে। মেসি যে আর্জেন্টিনার হয়ে পুরো ডানা মেলে খেলতে পারেন না। এর বড় কারণ, ম্যাচের আগে থেকেই তাঁকে ঘিরে ধরে হাজারটা চাপের শিকল। বার্সায় মেসি খেলতেন মনের আনন্দে, পায়ে পায়ে তাই ফুল ফুটত। কিন্তু ইদানীং মেসির চোখমুখ দেখলেই বোঝা যায়, কত বড় বোঝা পিঠে বয়ে চলেছেন। গত ম্যাচেই ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে নামার আগে মেসির মুখে রক্তিম আভা। কপাল কুঁচকে রেখেছেন। মাঠেও মেসিকে তাই মন খুলে খেলতে দেখা যায়নি।

বার্সা নিজেদেরই সর্বনাশ ডেকে আনছে দুভাবে। নিজেরা হারিয়ে যাচ্ছে, হয়তো হারানোর জোগাড়যন্ত্র করে বসে আছে লিওনেল মেসির সব জাদুও!